আলমগীর বলেনঃ অভিশপ্ত বেকার জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছি: দুবেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাওয়া সেই আলমগীর

আলমগীর বলেন, ‘বাবার আয়ে সংসার চলত। তবে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। এসএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের টাকা ছিল না। পরে আমার মায়ের কানের দুল বিক্রি করে ফর্ম ফিল-আপ করি।’ভাতের বিনিময়ে পড়ানোর বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর চাকরি পেয়ে আলমগীর কবীর এখন হতাশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মানসিকভাবে চাপমুক্তও হয়েছেন।

আলমগীর জানালেন, ‘গরীব মানুষের বেকার জীবন ভয়ানক কষ্টকর। এই পরিস্থিতিতে না পড়লে কেউ তা বুঝতে পারবে না। তবে বেকার জীবনের অভিশপ্ত জীবনে যখন চাকরির নিয়োগপত্র পেলাম তখন মনে হলো আজ থেকে নতুন জীবন পেলাম। আর এই খবর শোনার পর আমার মা তো খুশিতে কেঁদে ফেলেছেন।’

চাকরি পাওয়া নিয়ে শুক্রবার রাতে মোবাইলে তার সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের। বাংলাদেশর অন্যতম রিটেইল চেইন শপ ‘স্বপ্ন’তে চাকরি পেয়েছেন আলমগীর।বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তীর প্রচেষ্টায় স্বপ্নের ‘রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট’ পদে তাকে চাকরি দেওয়া হয়। গত বুধবার (২ ফেব্রুয়ারি) পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আলমগীরের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন স্বপ্নের পরিচালক সামসুদ্দোহা শিমুল।

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার শরাইল গ্রামের মো. কফিল উদ্দিনের ছেলে আলমগীর। ২০০৯ সালে তিনি বগুড়ায় এসে একটি মেসে ওঠেন। তিন মাস এক বড় ভাই তার খরচ দিয়েছিলেন। এরপর টিউশনি করেই তিনি নিজের খরচ জুগিয়েছেন।

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন আলমগীর। ভালো ফলাফলও করেছেন। তিনি এখন বগুড়া শহরের জহুরুলগর একতলা মসজিদ এলাকার পাশের একটি বাড়িতে থাকেন। এখানেও থাকেন বিনামূল্যে। খাবারের বিনিময়ে পড়াতে চেয়ে ভাইরাল হন তিনি।

আলমগীরের বিজ্ঞাপনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হওয়ার পর তিনি আলোচনায় আসেন। এরপর তাকে নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর হয়। এরপর থেকে বগুড়ায় তাকে নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

আলমগীরের জন্ম ১৯৯০ সালের ২০ মে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার শরাইল গ্রামে। ২০০৭ সালে নিজ এলাকার শরাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন।

ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে আলমগীর বলেন, ‘বাবার আয়ে সংসার চলত। তবে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। এসএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের টাকা ছিল না। পরে আমার মায়ের কানের দুল বিক্রি করে ফর্ম ফিল-আপ করি। স্কুলে ব্যাচের মধ্যে আমার রেজাল্ট সবচেয়ে ভালো ছিল। মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ৫০ পাই।’

আলমগীরের বাবা মো. কফিল উদ্দিন পল্লী চিকিৎসক। কয়েক বছর আগে বিঘা তিনেক জমি ছিল আলমগীরদের। কিন্তু বিভিন্ন অনটন ও বাবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমি বিক্রি করতে হয়। একইসঙ্গে স্থানীয় বাজারে আলমগীরের বাবাকে দোকান করে দিতেও কিছু টাকা খরচ হয়।

আলমগীর জানান, এখন তাদের এক থেকে দেড় বিঘা জমি আছে। এর মধ্যে অর্ধেকটা আবার ইজারা দেওয়া রয়েছে। কারণ তার বাবা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় তার চিকিৎসা করাতে অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে যায়। তখন বাবার ছোটখাটো ওষুধের দোকানও বিক্রি করতে হয়। এই সময়ে আলমগীরও টিউশনি হারাতে থাকেন। ইজারা দেওয়া বাদে যে জমি, সেখানে উৎপাদিত ধান দিয়েই তাদের সংসার চলে। তার বাবা এখন গ্রামের বিভিন্ন হাটে মানুষের প্রেসার ও ডায়বেটিকস মেপে সংসারের তরি-তরকারি, মাছ-শাক কেনেন।

অভাবের সংসারে বহুমাত্রিক সংকটের কথা তুলে ধরে আলমগীর বলেন, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। তার বড় ভাই রুহুল আমিন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। আর বড় তিন বোন রয়েছে। তাদের মধ্যে এক বোনের তালাক হয়েছে। তিনিও এখন বাবার সংসারে থাকেন।

এমন পরিস্থিতিতে আলমগীরও চাকরি পাচ্ছিলেন না। হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছিলেন ক্রমাগত। চাকরির খোঁজে ২০১৮ সালে ঢাকার সাভার যান আলমগীর। তখন এক বন্ধুর মেসে থাকতেন বিনা পয়সায়। বন্ধুর খাবারই ভাগাভাগি করে খেতেন।

একসময় বন্ধুর গার্মেন্টসে চাকরি হয়ে যায় গাজীপুরে। তখন আলমগীর দিশেহারা হযে পড়েন। ওই সময় সকালের নাশতার বিনিময়ে রাস্তার পাশের এক ফুচকার দোকানে কাজ নেন। পরে আলমগীরও এক গার্মেন্টেসে চাকরি নেন। ৮ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে ঢাকার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে আবার বগুড়ায় ফেরেন তিনি।

বগুড়ায় এসে টিউশনি করে ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনা মহামারি তার টিউশনির আয়ে বড়সড় আঘাত হানে। একটি বাদে সবকটি টিউশনি হারাতে হয় আলমগীরকে। এ কারণে বাধ্য হয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেন তিনি। বগুড়া শহরের জহুরুল নগর এলাকায় দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো সেই ফটোকপির বিজ্ঞাপনে লেখা, ‘শুধুমাত্র দু-বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’।

এই বিজ্ঞাপন দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাড়া ফেলে দেয়। বিজ্ঞাপনে আলমগীরের পেশা হিসেবে বেকার লেখা ছিল। সঙ্গে ছিল মোবাইল নম্বর। লেখা ছিল, সকাল ও দুপুরের খাবারের বিনিময়ে পড়াতে চান। বিষয়টি নজরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপর এ নিয়ে প্রতিবেদনও হয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এরপর থেকে আলমগীরের কাছে ক্রমাগত চাকরির প্রস্তাব আসতে থাকে। এর মধ্যে বগুড়া জেলা পুলিশের সহায়তায় সুপারশপ স্বপ্নে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ করেন এই শিক্ষার্থী।

চাকরির বিষয় নিয়ে কথা বলতেই আলমগীর জানান, ‘মানুষ আমার দেওয়া বিষয়টি বাজেভাবে উপস্থাপন করছে। অনেকে বলছে, এটা সরকারের ব্যর্থতা। আমি এমন কিছু বোঝাতে চাইনি। বরং আমি শুরু থেকেই বলে আসছি সরকারির চাকরি পাওয়ার জন্য আমাকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়ে টিকে থাকার জন্য খাবারের বিনিময়ে পড়াতে চেয়ে বিজ্ঞপন দেওয়া।’

দেয়ালে দেয়ালে এমন বিজ্ঞাপন দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আলমগীর জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি এখন একটি টিউশনি করান। সেখান থেকে মাসে দেড় হাজার টাকা পান। এই টাকা দিয়ে দিনে একবেলা খাবারের বন্দোবস্ত হয়ে যায়।

এছাড়া চাকরি আবেদন ও পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রায়শই তাকে ঢাকায় আসতে হয়। এই যাওয়া-আসাতেও অনেক খরচ হয়ে যায়। যে কারণে সংকট দেখা দেয় তার খাবারের খরচে।

সবকিছু মিলিয়ে নিজের জন্য দিনে তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে কষ্ট হচ্ছিল আলমগীরের। তাই বাসার আশেপাশে ভাতের বিনিময়ে পড়ানোর জন্য বিজ্ঞাপন দেন।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে আলমগীর কবির বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করে বড় হয়েছি। দুবেলার খাবারও আমি এমনি চাইনি। পড়ানোর বিনিময়ে চেয়েছি। এটা খুবই স্বাভাবিক চাওয়া। কিন্তু মানুষ একে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে যে এখন লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। আমি এই বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের উন্নয়নবিরোধী কোনো কথা বলিনি। এমন কিছু বোঝাতেও চাইনি। এ নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই।’

গণমাধ্যমে সংবাদ আসার পর একটি প্রথম সারির দৈনিকের বগুড়া প্রতিনিধি আনোয়ার পারভেজের কাছে ছয়জন ফোন করেন আলমগীরকে চাকরি বা সহায়তা দেওয়া জন্য। আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘আলমগীরের বিষয়টি খুব দেশের জন্য খুব সেনসেটিভ। তাকে নিয়ে সংবাদ হওয়ার পর চট্টগ্রাম, ঢাকার স্বনামধন্য কোম্পানিসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে ফোন আসে, তাকে চাকরি কিংবা সহায়তার জন্য। বিষয়টি আলমগীরকে জানানো হয়। তখন আলমগীর জানান, তিনি সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কারণ এর মধ্যেই তিনি একাধিক চাকরির পরীক্ষায় (লিখিত) টিকে রয়েছেন। হয়তো চাকরিও হয়ে যাবে। কিন্তু আপাতত খাবার দরকার। এই কারণে তিনি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।’

নতুন চাকরি পাওয়া নিয়ে আলমগীর বলেন, ‘বেকার জীবনের হতাশায় থেকে দিনে দিনে ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম। বাবা অসুস্থ, আমি কিছু করতে পারছি না। মাস্টার্স পাস করে এই বিষয়টি চিন্তা করলে পাগল হয়ে যেতাম। তারা কী খায়, কীভাবে চলে, কোনো খবরই নিতে পারতাম না লজ্জায়। সব মিলে খুব চাপের মধ্যে ছিলাম। এর মধ্যে জেলা পুলিশের মাধ্যমে চাকরি হওয়ার পর অদ্ভুত এক প্রশান্তি পেলাম। ফেসবুকে অনেকের গালমন্দ থেকে মুক্তি পেলাম। নতুন চাকরির কথা শুনে আমার পরিবার, এলাকার লোকজন ব্যাপক খুশি।’

আলমগীর জানান, তার চাকরি হয়েছে স্বপ্ন সুপার শপের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘আগামী রোববার বা সোমবারে চাকরিতে জয়েন করব। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা ও ভাইভা দেব। সরকারি চাকরি হয়ে গেলে সেখানে জয়েন করব। আমার সংকটময় সময়ে পাশে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’