রহস্যময় টগভগে ফুটন্ত নদীর সন্ধ্যান, জীবন্ত প্রাণী পুড়ে মারা যায়।


আমাজনের গহীন অরণ্যে এক রহস্যময় নদীর খোঁজ পেয়েছেন তারা। যে নদীর পানি টগবগ করে ফুটছে। যেখানে পানির গড় তাপমাত্রা ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সেই নদীর পানিতে জীবন্ত কোন প্রাণী এলে পুড়ে মারা যায়। রহস্যময় এ নদীর নাম শান্যাই-টিম্পিশকা। আমাজনের গহীন অরণ্যে এই রহস্যময় নদীর খোঁজ পান আন্দ্রেজ রুজো। রূপকথার গল্পের বয়ে চলা সেই ফুটন্ত পানির নদী যে বাস্তবেই আছে, তা গোটা দুনিয়াকে জানিয়েছেন আন্দ্রেজ।

২০১৪ সালে টেডএক্স-এর এক বক্তৃতায় এ নদী নিয়ে তার অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ প্রায় সমস্ত তথ্য-উপাত্ত এবং ফলাফল সকলের সামনে তুলে ধরেন আন্দ্রেজ রুজো।

পেরুর ভূ-বিজ্ঞানী আন্দ্রেজ রুজো বলেন, ‘আমাজনে কোনো আগ্নেয়গিরি নেই। পেরুর বেশিরভাগ অংশেও নেই। যে স্থানটিতে এই ‌‘ফুটন্ত নদী’ রয়েছে তা নিকটতম আগ্নেয়গিরির কেন্দ্র থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে। সত্যি বলতে, আমি রূপকথার গল্পে থাকা আমাজনের সেই ‘উষ্ণ-প্রস্রবণ’ দেখতে পেয়েছি তা সত্যিই বিস্ময়কর। আমি দূর থেকে নদীটির মৃদু তরঙ্গ শুনতে পেয়েছিলাম। যা কাছে আসার সাথে সাথে ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল। অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের ক্রমাগত আছড়ে পড়ার শব্দের মতো শোনাচ্ছিল। এরপর যত কাছে গিয়েছি গাছের মধ্য দিয়ে তত ধোঁয়া ও বাষ্প উঠে আসতে দেখেছি।’

‘অতঃপর আমি এটা (ফুটন্ত নদী) দেখতে পেলাম। আমি সাথে সাথে পানিতে থার্মোমিটার ধরলাম, এবং গড় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। নদীটি গরম ছিল এবং দ্রুত প্রবাহিত হচ্ছিল।’ বলেন আন্দ্রেজ

তিনি বলেন, ‘আমি এই নদীকে অনুসরণ করে কিছুদূর চলতে থাকলাম। সেখানে একটা অদ্ভুত বিষয় দেখতে পেলাম। নদীর পবিত্র স্থান শামানের আখড়া থেকে ঠাণ্ডা স্রোতের প্রবাহ দেখা যায়।’

আন্দ্রেজ বলেন, ‘আমি কোনভাবেই প্রথম বহিরাগত ছিলাম না, যে নদীটি দেখেছে। এটা শামানদের দৈনন্দিন জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা এ নদীর পানি পান করে। এর বাষ্প গ্রহণ করে। রান্নার কাজে ব্যবহার করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সারে। এমনকি নদীর পানি দিয়ে ওষুধও তৈরি করে।’

তিনি বলেন, আমরা নদীর ধারের তাপমাত্রা ম্যাপ করেছি। সেখানে এর ফলাফল ছিল অবাক করার মতো। শুরুতে নদী ঠাণ্ডা হতে শুরু করেছে। তারপরে, উত্তপ্ত হয়ে আবার ঠাণ্ডা হচ্ছে, আবার উত্তপ্ত হয়ে আবার ঠাণ্ডা হচ্ছে, আবার উত্তপ্ত হচ্ছে, এবং যতক্ষণ না ঠাণ্ডা পানির নদীতে গিয়ে মিশেছে।

‘আমি নদীতে বিভিন্ন প্রাণীকে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি। এটা আমাকে অবাক করেছে। কারণ, সকল ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি প্রায় একই রকম। প্রাণীগুলো যখন নদীর পানিতে পড়ে, প্রথমেই প্রচণ্ড উত্তপ্ত পানিতে তার চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোখ খুব তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়ে যায়। দেখতে দুধ-সাদা রঙের হয়ে যায়। এরা সাঁতরে পার হওয়ার চেষ্টা করতেই থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে এদের পেশী ও হার সেদ্ধ হতে শুরু করে। কারণ, পানি খুব উত্তপ্ত। যতক্ষণ না উত্তপ্ত পানি প্রাণীর মুখে গিয়ে এটা ভেতর থেকে সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে, এগুলো শক্তি হারাতেই থাকে। একপর্যায়ে পুড়ে মারা যায় প্রাণীগুলো।’ বলেন আন্দ্রেজ

তিনি বলেন, এ নিয়ে নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন। তবে হাইড্রোথার্মাল সিস্টেমের কারণে এমন হতে পারে। তবে আমরা ফুটন্ত নদীতে বসবাসকারী নতুন লাইফফর্ম ও অনন্য প্রজাতি খুঁজে পেয়েছি। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ