হিজাব নিষিদ্ধের আবেদন শুনতে অস্বীকৃতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের


ভারতে চলমান হিজাব বিতর্কের মধ্যে গত শুক্রবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে যে, ‘তারা শুধুমাত্র একটি উপযুক্ত সময়ে হস্তক্ষেপ করবে’। এক প্রতিবেদনে একথা জানিয়েছে ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি।

রাজ্যের উচ্চ আদালত বৃহস্পতিবার স্কুল ও কলেজে হিজাব বিধিনিষেধ সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ‘ধর্মীয় পোশাক’ পরিধান না পরার পরামর্শ দেয়ার পর ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের একটি মেয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। এ বিষয়ে জরুরি শুনানি করতে অস্বীকারকারী প্রধান বিচারপতি এনভি রামানাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘এসব জিনিস জাতীয় স্তরে ছড়িয়ে দেবেন না। আমরা শুধুমাত্র একটি উপযুক্ত সময়ে হস্তক্ষেপ করব’।

প্রতিবেদন অনুসারে, যখন একজন আইনজীবী মামলাটির ‘সুদূরপ্রসারী প্রভাব’ রয়েছে এবং ছাত্ররা ১০ বছর ধরে হিজাব বা হেডস্কার্ফ পরে আসছে যুক্তি দিয়ে আদালতকে এটি গ্রহণ করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট ছিল অনড়।

প্রধান বিচারপতি রামানা বলেন, ‘অনুগ্রহ করে এটিকে বড় স্তরে ছড়িয়ে দেবেন না… আমরা জানি কী ঘটছে। ভেবে দেখুন, এসব জিনিস দিল্লিতে জাতীয় স্তরে আনা কি ঠিক? যদি কিছু ভুল হয়, আমরা রক্ষা করব…’। বৃহস্পতিবার কর্ণাটক হাইকোর্ট বলেছে, স্কুল এবং কলেজগুলো ছাত্রদের ক্লাসরুমে হিজাব না পরার নির্দেশ দিতে পারে কিনা তা সিদ্ধান্ত নিতে সোমবার বিষয়টিতে আবার শুনানি হবে। কর্ণাটক হাইকোর্ট-এর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বিচারকদের একটি প্যানেলকে উল্লেখ করার সময় এ মামলার শুনানিকারী বিচারককে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘এসব বিষয় ব্যক্তিগত আইনের কিছু দিক বিবেচনা করে মৌলিক গুরুত্বের কিছু সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে, পিটিশনকারীদের কৌঁসুলি অন্তর্বর্তী আদেশে আপত্তি জানিয়ে বলেছেন যে, এটি ‘আমাদের অধিকার স্থগিত করার’ সমান, দ্য ওয়্যার প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

স্কুলে ইসলামিক হেডস্কার্ফ বা হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দক্ষিণ ভারতের মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, যেখানে বিশাল জনতা এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছে। কর্ণাটক রাজ্যের অচলাবস্থা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় জাগিয়ে তুলেছে যে, তারা যা বলে তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে নিপীড়ন বাড়াচ্ছে। গেরুয়া স্কার্ফ গোষ্ঠীর সামনে রাষ্ট্রযন্ত্র অসহায়। পরিবর্তে, কিছু ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে বিবৃতি জারি করছেন যা আরএসএস সদস্যদের পরিস্থিতি উস্কে দিতে উৎসাহিত করে।

অনলাইনে ব্যাপকভাবে শেয়ার করা একটি ভিডিওর একটি ঘটনায়, হিজাব পরা এক একা মুসলিম ছাত্রী কর্ণাটকে তার স্কুলে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় হিন্দু যুবকরা ধর্মীয় সেøাগান দিয়ে ঘিরে ধরে।
রয়টার্সের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, বুধবার কলকাতায় বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা প্রধানত হিজাব পরা মহিলা ছিলেন, যোগ করেছেন যে বিক্ষোভগুলো ঘটনা ছাড়াই ছিল। বিক্ষোভকারীদের একজন তাসমিন সুলতানা বলেন, ‘সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অপমান বন্ধ না করবে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা আমাদের মৌলিক অধিকার ফিরে চাই… আপনি আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবেন না’।

কর্ণাটকের সরকার, যেখানে জনসংখ্যার ১২ শতাংশ মুসলিম এবং যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বারা শাসিত, একটি আদেশে বলেছে যে, শিক্ষার্থীদের স্কুলের নির্ধারিত ড্রেস কোডগুলো অনুসরণ করা উচিত।

এদিকে ইউএস অফিস অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (আইআরএফ) বলেছে, হিজাব নিষেধাজ্ঞা ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে এবং নারী ও মেয়েদের কলঙ্কিত ও প্রান্তিক করে’। উল্লিখিত মন্তব্যের এক দিন পর এমইএ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

আইআরএফ-এ মার্কিন রাষ্ট্রদূত-অ্যাট-লার্জ রাশাদ হুসাইন এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে একজনের ধর্মীয় পোশাক বেছে নেওয়ার ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ধর্মীয় পোশাকের অনুমতি নির্ধারণ করা উচিত নয়। স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করা ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে এবং নারী ও মেয়েদের কলঙ্ক ও প্রান্তিক করে তোলে’।

জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর (এমইএ) গতকাল বলেছে যে, হিজাব ইস্যুটি কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচার বিভাগের পরীক্ষাধীন এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে স্বাগত জানানো হয় না। এমইএ কর্ণাটকের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পোষাক কোড সম্পর্কে কিছু দেশের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় একথা বলেছে।

এমইএ’র মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেছেন, ‘কর্নাটকের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ড্রেস কোড সংক্রান্ত একটি বিষয় কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচার বিভাগীয় পরীক্ষার অধীনে রয়েছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্যগুলোকে স্বাগত জানানো হয় না’।

মঙ্গলবার কর্ণাটকে হিজাব বিতর্ক সহিংস মোড় নেওয়ায়, রাজ্য সরকার রাজ্য জুড়ে উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজগুলোর জন্য তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। গতকাল থেকে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবারো খুলেছে।
মুখপাত্রের মন্তব্যে যোগ করা হয়েছে, ‘আমাদের সাংবিধানিক কাঠামো, গণতান্ত্রিক নীতি এবং রাজনীতি হল প্রেক্ষাপট যেখানে সমস্যাগুলো বিবেচনা করা হয়, সমাধান করা হয়’। সূত্র : এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, টাইমস অব ইন্ডিয়া।