দেবর ভাবির পরকীয়া, হোটেলে দেবর ভাবিকে খুন করেন!পুলিশের হাতে আটক।


পরকীয়া প্রেমের টানেই ১০ বছরের ছোট দেবরের সঙ্গে স্বামীর সংসার ছেড়েছিলেন তিন সন্তানের জননী শাহিদা জাহান সুমি। শেষ পর্যন্ত সেই দেবরের হাতেই প্রাণ দিতে হলো তাকে। চট্টগ্রাম নগরের এক হোটেলে নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আশরাফুল ইসলাম সুজন (২৫) নামে এক যুবককে গতকাল রাতে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত সোয়া ১১ টার দিকে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের “রোজ উড’ নামে একটি আবাসিক হোটেলের ৮০২ নং কক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তদন্তে নেমে সুজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানতে পারে, ওই নারীর নাম শাহিদা জাহান সুমি (৩৫)। তিনি বিবাহিত। তার স্বামী ও তিন সন্তান আছে। গ্রেপ্তার সুজনের সাথে তার পরকীয়া সম্পর্ক ছিল।

গ্রেপ্তারের পর সুজন পুলিশকে জানান, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮ টা ১৫ মিনিটে হোটেল রিসিপশনে হাজির হয়ে কামরুল হাসান নামে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি উপস্থাপন করেন। ওইদিন বিকাল অনুমান ৪ টা ১৪ মিনিটে শাহিদাকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে হোটেল কক্ষে নিয়ে আসেন। এরপর তাকে গলাকেটে খুন করে বিকাল সাড়ে ৫ টায় হোটেল কক্ষের দরজা লক করে পালিয়ে যান। এদিকে রাত ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ওই কক্ষ থেকে সাড়া শব্দ না পেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি হালিশহর থানাকে জানায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে অজ্ঞাত হিসেবে শাহিদার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ হালিশহর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলা তদন্তকালে হোটেলের রেজিস্ট্রার, ওই যুবকের জাতীয় পরিচয়পত্র, সিসিটিভি ফুটেজ, হোটেল রুমে প্রাপ্ত আলামত পর্যালোচনা করে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে ঘটনার সাথে জড়িত আশরাফুল ইসলাম ওরফে সুজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। সুজনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে ভিকটিম সুমির শ্বশুর বাড়ির পাশে। সম্পর্কে সুমির দেবর হন সুজন। তবে সুজন মা-বাবাদের সাথে থাকেন ঢাকার উত্তরায়।

রোববার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ২টার দিকে হালিশহর থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার দক্ষিণ গাজীর চট এলাকা থেকে দুলাভাইয়ের বাসায় আত্মগোপনরত অবস্থায় ঘাতক আশরাফুল ইসলাম সুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহিদা খুনের ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততা স্বীকার করেন। সুজন পুলিশকে জানান, তিনি মা-বাবার সাথে ঢাকার উত্তরায় নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। উত্তরা ল্যাব এইড হাসপাতালে রিপোর্ট ডেলিভারি সেকশনে চাকুরি করেন। ভিকটিম শাহিদা জাহান সুমির (৩৫) স্বামীর নাম জাহাঙ্গীর। বাবার নাম- গোলাম রসুল বাচ্চু৷ ৩ সন্তানের সাথে বন্দর থানা এলাকার বাবার বাড়ি কলসী দিঘীর পাড়ে বসবাস করতেন শাহিদা।

সন্দেহ করায় স্বামীর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয় শাহিদার। গত ১ বছর ধরে ৩ সন্তান নিয়ে হালিশহরে বাবার বাড়িতেই বসবাস করে আসছিলেন শাহিদা। সম্পর্কে দেবর হওয়ার সুবাদে শাহিদার সাথে সুজনের ঘনিষ্ঠতা হয়। গত দুই বছর ধরে তাদের মধ্যে পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি শাহিদার সাথে অন্য কোন ব্যক্তির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে শাহিদাকে সন্দেহ করতেন সুজন। মনোমালিন্যের কারণে ক্ষোভ থেকে শাহিদাকে খুনের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন দোকান থেকে ছুরি, পানীয়, ঘুমের ওষুধ ক্রয় করেন সুজন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পৌঁছেন সুজন। ওইদিন সকাল ৬ টা ৭ মিনিটে রোজ উড হোটেলে উপস্থিত হন সুজন। বিকাল সাড়ে ৪ টায় ভিকটিম শাহিদাকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে হোটেলের ৮০২ নং রুমে নেন সুজন।

এরপর শাহিদাকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানীয় পান করতে দেন সুজন। এরপর কিছুটা অচেতন হওয়ার পরপরই ছুরি দিয়ে গলা ও পেটে আঘাত করে ভিকটিমের মৃত্যু নিশ্চিত করেন সুজন৷ ঘাতক সুজন তার রক্তমাখা জামা কাপড় শাহিদার লাশের পাশে রেখে নতুন জামা কাপড় পরে বিকাল সাড়ে ৫ টায় রুম বন্ধ করে পালিয়ে যান। তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও তার পরিচয় গোপন করার জন্য আসামি সুজন হোটেলে অপর ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, ভুয়া মোবাইল নম্বর উপস্থাপন করেন। চতুরতার সাথে ভিকটিমের কোন জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর বা ঠিকানাও উক্ত হোটেলে প্রদান করেননি।

পুলিশ জানায়, আবাসিক হোটেলের নিয়ম অনুযায়ী হোটেলে কর্তৃপক্ষ আসামি কর্তৃক উপস্থাপিত জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই না করায় এবং আসামি ও ভিকটিমের মাস্কবিহীন ছবি সংরক্ষণ না করায় তাৎক্ষণিকভাবে আসামি ও ভিকটিমের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। হালিশহর থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে ক্লু-লেস মামলাটির রহস্য উদঘাটন, আসামি ও ভিকটিমের পরিচয় শনাক্ত এবং আসামি গ্রেপ্তার সম্ভব হয়েছে।’