ভিক্ষুকদের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়েছেন তারাঃ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব


বেআইনিভাবে ক্ষুদ্র ঋণদান সমিতির নামে অবৈধ ব্যাংকিং লেনদেনের সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪। রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকায় তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। র‌্যাব বলেছে- মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, সেলুনের কর্মচারী, ফুটপাতের দোকানদার, গৃহকর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের ঋণের লোভ দেখিয়ে সঞ্চয়ের নামে ডিপিএস করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো।

প্রতারণার কৌশল হিসেবে ভুক্তভোগীদের বোঝানো হতো, দৈনিক মাত্র ২০০-৩০০ টাকা জমা করলে এক সময় ঢাকা শহরে তাদের একটি করে ফ্ল্যাট বা জমি দেয়া হবে। চক্রটি এভাবে গত ৫ মাসে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

গ্রেপ্তাররা হলেন- শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ফয়েজউল্লাহ (৫০) এবং দুই নারী সহযোগী আফরিন আক্তার (২৪) ও মোছা. তাসলিমা বেগম (৩৩)। মঙ্গলবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে ব্যাটালিয়ান ৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইডি মোজাম্মেল হক এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মিরপুর এলাকার কিছু ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত র‌্যাব-৪-এর একটি দল মিরপুর শাহ আলীর মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান পরিচালনা করে। এসময় প্রতারণার দায়ে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’-এর সভাপতিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অতিরিক্ত ডিআইডি মোজাম্মেল হক জানান, প্রতিষ্ঠানটি ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ হিসেবে রেজিস্টার্ডভুক্ত হলেও প্রতারণামূলকভাবে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে প্রচার ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ২০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে ওই সমিতিতে ২৫০-৩০০ জন সদস্য রয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়। প্রতিষ্ঠানের কোনও রক্ষিত জামানত নেই বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এর অফিস থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ভর্তি ফরম, ঋণ গ্রহীতার ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের জীবনবৃত্তান্ত, লিফলেট, সিল, বিভিন্ন নামের সঞ্চয় পাসবই, অব্যবহৃত পাস বই, দৈনিক কিস্তি ও ঋণ বিতরণের বিভিন্ন রেজিস্টার, ব্যাংকচেকসহ ব্যাংক স্ট্যাম্প, আইডি কার্ড, দৈনিক কিস্তি আদায়ের শিট, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের ঋণের আবেদনপত্র, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের সঞ্চয় ও ঋণ পাস বই, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের হিসাব খোলার আবেদন, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের অব্যবহৃত ডেবিট ভাউচার বই, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন সঞ্চয় আদায় শিট, ফয়েজউল্লাহর নামে কমিউনিটি ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির বিভিন্ন প্রকার সার্টিফিকেট, চেক বই, মনিটর, সিপিইউ উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, সেলুনের কর্মচারী, ফুটপাতের দোকানদার, গৃহকর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ঋণের লোভ দেখিয়ে সঞ্চয়ের নামে ডিপিএস করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এরপর মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা ভুক্তভোগীদের প্রলুব্ধ করে ও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে নানান কৌশলে অফিস কার্যালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতো। প্রতিদিন আনুমানিক ২৫০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করা হতো।

র‌্যাব ৪-এর অধিনায়ক বলেন, মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প প্রচার করে যেমন-১. মুদারাবা ডিপোজিট স্কিম, ২. মুদারাবা কোটিপতি বিশেষ সঞ্চয়, ৩. মুদারাবা লাখপতি ডিপোজিট স্কিম, ৪. মুদারাবা মিলিওনিয়ার ডিপোজিট স্কিম, ৫. মুদারাবা পেনশন ডিপোজিট ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়া হতো।

স্বল্প সময়ে ঋণের কথা বলে সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ডিপিএস করতে আগ্রহী করা হতো ভুক্তভোগীদের। বলা হতো ১০-১৫ দিন ঠিকমতো নির্দিষ্ট হারে সঞ্চয় দিলে তাদের ঋণ দেয়া হবে। কিন্তু দু’একজনকে ঋণ দিলেও কেউ সঞ্চয় থেকে ঋণ পেতো না। কোম্পানির কিছু সদস্য দৈনিক ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সঞ্চয় বা ডিপিএসের টাকা সংগ্রহ করতো। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো। বলা হতো, সময়মতো সঞ্চয় বা ডিপিএসের টাকা পরিশোধ না করলে সঠিক সময়ে ঋণ দেয়া হবে না বা মেয়াদ শেষে তারা মুনাফা কম পাবে এবং জরিমানাও করা হবে।

প্রতারণার আর একটি কৌশল হিসেবে ভুক্তভোগীদের বোঝানো হতো, দৈনিক মাত্র ২০০-৩০০ টাকা জমা করলে এক সময় ঢাকা শহরে তাদের একটি করে ফ্ল্যাট বা জমি দেয়া হবে।

কে এই ফয়েজ: গ্রেপ্তার ফয়েজ সর্ম্পকে র‍্যাব ৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইডি মোজাম্মেল হক বলেন, ফয়েজের বাড়ি জেলা ভোলায়। তিনি ভোলার স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। পরে ১৯৯২ সালে ভোলা থেকে ঢাকায় এসে কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করেন। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি কাফরুলের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড অফিসার পদে চাকরি করেছেন।

২০২১ সালে নিজে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই সমিতির নাম বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এর কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন।

তথ্য অনুযায়ী, এই কোম্পানির মোট সদস্য সংখ্যা ২৫০-৩০০ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৫ মাসে আনুমানিক ৫০ লাখের বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।