প্রেমের ফাঁদে যেভাবে নৃশংস হত্যার শিকার হয় কলেজছাত্র মিঠু হোসেনকে!


নরসিংদীর মনোহরদীতে আলোচিত কলেজছাত্র মিঠু হোসেন হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। একইসাথে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ বেশকিছু তথ্য।আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছেন, এসব শুধুমাত্র গতানুগতিক সংবাদ নয় বরং এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের জন্য একধরনের সতর্কবার্তাও! এমন একের পর এক ঘটনার পেছনে মুলত ভুক্তভোগীদের অসতর্কতাও কম দায়ী নয়।

প্রেমের ফাঁদে ফেলে সিরাজগঞ্জ থেকে নরসিংদী এনে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছিলো মিঠুকে। এ ঘটনায় এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আটকদের জবানবন্দীতে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। রবিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নরসিংদীর পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম।

গত বৃহস্পতিবার সকালে মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের হুগলিয়াপাড়ার একটি খড়ের গাদার পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত মিঠু সিরাজগঞ্জ সদরের রায়পুর রেলওয়ে কলোনি এলাকার মুসলিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি সিরাজগঞ্জের একটি ডিগ্রি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা করতেন। বাবুরহাটের শাড়ি সম্পর্কে ধারণা নিতে প্রথমবারের মতো নরসিংদীতে এসেছিলেন। ফেসবুকে পরিচয় হওয়া দুই বন্ধুর ভরসায় নরসিংদীতে আসলে অপহরণের পর হত্যার শিকার হন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের হুগোলিয়াপাড়া এলাকার রূপচান মিয়ার খড়ের পালার পাশে অজ্ঞাত ওই যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহতের গলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মিঠু হোসেনের বড় বোন মিনু আক্তার বাদী হয়ে মনোহরদী থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম জানান, মিঠু হোসেনকে অপহরণ ও হত্যায় জড়িত সন্দেহে রবিবার ভোরে গাজীপুরের শ্রীপুর ও নরসিংদীর শিবপুর থেকে শাহনাজ আক্তার পপি ও তার স্বামী আব্দুল বাতেন ও কাকন খান নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করার পর রহস্য উদঘাটন হয়।

পপির সাথে ফোনে কথা বলা ও ফেসবুকের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণের পর মুক্তিপণ না দেওয়ায় হত্যা শেষে খড়ের গাদায় মিঠু হোসেনের মরদেহ গুম করা হয় বলে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে জানায় গ্রেপ্তার হওয়া পপি।

এ ঘটনায় জড়িত তার স্বামীসহ সহযোগী প্রতারকচক্র। এ চক্রের মূলহোতা হানিফ নামে আরো একজন বলে জানায় শাহনাজ আক্তার পপি।

কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, এই প্রতারকচক্রের সদস্য গাজীপুরের শ্রীপুরের মিঠালু এলাকার শাহনাজ আক্তার পপি ও তার স্বামী আব্দুল বাতেন, শিবপুরের দুলালপুরের আশুটিয়া এলাকার কাকন খানসহ ৩/৪ জন। এই চক্রের দলনেতা পপি নিজের ছদ্মনাম ব্যবহার করে সুন্দরী মেয়েদের ছবি ব্যবহার করে একাধিক ফেসবুক আইডি খোলেন। এসব আইডিতে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও আপলোড করা হতো। এতে লাইক, কমেন্টস করলে বিভিন্ন লোকজনকে টার্গেট করত প্রতারকরা।

এসব আইডির মাধ্যমে টার্গেট করা বিভিন্ন লোকদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় দেখা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পপিসহ এই চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে কেউ এগিয়ে গেলে তাঁকে আটক করে মারধর ও মুক্তিপণ দাবি করে প্রতারকচক্র। এই অপরাধের ধারাবাহিকতায় ফেসবুকে বন্ধুত্ব, চ্যাটিং ও ফোনে কথা বলার পর পপির প্রেমের ফাঁদে পরে মিঠু হোসেন সিরাজগঞ্জ থেকে নরসিংদীতে গেলে পপির সহযোগী প্রতারকচক্রের মাধ্যমে তাকে অপহরণ করে শিবপুরের আশুটিয়ার অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখা হয়।

পরে ফোনে তাদের দাবি অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণ না দেওয়ায় সহযোগী প্রতারক চক্রের সদস্যদের হাতে শিবপুরের আশুটিয়া এলাকায় খুন হয় মিঠু। পরে তার মরদেহ গুম করা হয় মনোহরদীর একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের হুগলিয়াপাড়ার একটি খড়ের গাদার পাশে। বৃহস্পতিবার খড়ের গাদার পাশ থেকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে মিঠু হোসেন (২৪) এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।