যাত্রাবাড়ীতে এক দোকানে ৬০ ব্যারেল তেল মজুদ

অতি মুনাফালোভী একটি ব্যবসায়িক চক্র কৃত্রিমভাবে বাজারে ভোজ্য তেলের সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। সয়াবিন তেল একরকম উধাও হয়ে গেছে বাজার থেকে। দুই ও পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলও মিলছে না সব দোকানে। আবার অনেক দোকানদার সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ভোজ্য তেলের বাজারে এখন চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। শুধু তাই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বাজারে ভোজ্যতেল চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গতকাল রাজধানীর যাত্রীবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে এমন অভিযোগের সতত্যও মিলেছে। সয়াবিন তেলের অতিরিক্ত দাম রাখায় যাত্রাবাড়ীর আবুল খায়ের ট্রেডার্স নামের একটি ডিলারের দোকান সিলগালা করা হয়। এই ডিলারের কাছে থাকা ৬০ ব্যারেল ভোজ্যতেল জব্দ এবং দুই লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়।

জানা যায়, সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বেশি দামে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগে যাত্রাবাড়ীতে আবুল খায়ের ট্রেডার্স নামের তেলের আড়ত সিলগালা করে দেয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গতকাল শনিবার সকালে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন ভোক্তা অধিদফতরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার।

তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত দাম ১৪৩ টাকা হলেও প্রতিষ্ঠানটি ১৭৩ থেকে ১৭৬ টাকায় খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি করছিল। এমনকি তারা তেল কেনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রসিদ দেখাতে পারেনি।
মনজুর বলেন, আমাদের এক প্রতিনিধি দোকানটিতে খুচরায় তেল কিনতে আসেন। তখন তারা ১৭৬ টাকা দাম চায়। ক্রেতা রসিদ চাইলে তারা জানায়, রশিদ দিয়ে মাল বিক্রি হবে না, নিলে নেন, না নিলে চলে যান। তারা সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে প্রতি লিটারে প্রায় ৩০ টাকা বেশিতে বিক্রি করছিল। প্রতিষ্ঠানটিকে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হয়েছে এবং কারখানা সিলগালা করে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে কি না, সেটা অধিদফতেরর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। দোকানটিতে কমপক্ষে ৬০ ড্রাম তেল মজুত করা আছে বলে বলেন ওই কর্মকর্তা।

তবে এভাবে দোকান সিলগালা করে দেয়ায় ক্ষোভ জানিয়ে দোকানের মালিক বলেন, আমরা ডিলারদের কাছ থেকে রসিদ দিয়ে মাল কিনতে পারছি না। আমাদের বলা হয় মাল নিলে নেন, না নিলে চলে যান; অনেক পাইকারি ক্রেতা আছেন। আপনার কাজ তেল বেচা, রসিদ দিয়ে আপনি কী করবেন?

তিনি বলেন, আমরা প্রতি লিটার ১৭১ টাকা ৮৯ পয়সায় কিনে আনি। পাইকারিতে ১৭২ টাকা এবং খুচরা ১৭৩ থেকে ১৭৪ টাকা বিক্রি করি। আমাদের কি দোষ। দেশে তেল সাপ্লাই দেয় কয়টা প্রতিষ্ঠান, তা সবাই জানে। বড় জায়গায় ধরলে কোনো সমস্যা থাকবে না। আমাদের ধরে লাভ কি?

তবে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। ২০২১ সালে ২৭ লাখ ৭১ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। সে হিসেবে তেলের মজুদ ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। গত বুধবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক শেষে বাজিণ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ রয়েছে। সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১২ টাকা বাড়ানোর জন্য মিল মালিকদের প্রস্তাব নাকচ করার বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, সামনে রমজান মাসের বিষয়টি মাথায় রেখে তা করা হয়েছে। যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটা মানতে হবে জানিয়ে বাজারে তেলের এ সংকটের কারণে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৬৮ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল লিটারে ৭ টাকা বাড়িয়ে ১৪৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ঠিক করা হয় ৭৯৫ টাকা। এর ২০ দিনের মাথায় গত সপ্তাহে আবার সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১২ টাকা করে বাড়াতে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব দিলেও তাতে সায় দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সরকারের সায় না পাওয়ার তিন দিনের মাথায় বাজারে সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত চাহিদায় টান পড়েছে। মিলছে না খোলা সয়াবিন তেলও। সংকটের সুযোগে বাড়ানো হয়েছে দামও। আর বাড়তি মুনাফার জন্য বোতলজাত তেল খুলে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া রাজধানীর কিছু বড় দোকান এবং সুপার শপ ঘুরে পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেলও দেখা গেছে খুবই সামান্য পরিমাণ। ছোট বাজার কিংবা অলিগলির দোকানে সেটাও নেই। কিছু দোকানে ৫০০ গ্রাম থেকে দুই লিটারের বোতলজাত তেল পাওয়া গেলেও দাম বেশি। গত কয়েক দিন ধরে এমন সংকট দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে প্রতি লিটার বোতলজাত তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। আর ৫০০ গ্রামের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। কোথাও কোথাও বোতল থেকে মূল্যও মুছে ফেলা হয়েছে। তবে খোলা সয়াবিন তেল বাজার থেকে ‘একেবারে উধাও’ হয়ে গেছে বলে দোকানিদের ভাষ্য। তারা বলছেন, খোলা তেল কিছু কিছু দোকানে পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি। তাদের অভিযোগ, আসলে সেসব খোলা তেল নয়, বোতল থেকে খুলে খোলা তেল হিসেবে কেউ কেউ বিক্রি করছেন; যা লিটারে বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায়।

রাজধানীর রামপুরা, হাজীপাড়া বউবাজার, মালিবাগ ও শান্তিনগর বাজারের বেশ কয়েকজন বিক্রেতা জানান, খোলা তেলের দাম বেশি হওয়ায় বোতলের তেল ভেঙে কোনো কোনো দোকানি খোলা তেল হিসেবে মেপে বিক্রি করছেন। ক্রেতারা জানান, খুচরা বাজারসহ অলিগলির একাধিক দোকান ঘুরেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেককে তেল ছাড়া অন্যান্য বাজার-সদাই নিয়ে ফিরে যেতে হয়।

গতকাল পশ্চিম তেজতুলী বাজার এলাকার বসিন্দা তুহিন আহমেদ বলেন, আমি দেখলাম বহু দোকানে তেল নেই। এরা বলছে, কোম্পানি নাকি সাপ্লাই বন্ধ রেখেছে। পাঁচ লিটারের কোনো তেল পাওয়া গেল না। ১৮০ টাকা দরে দুই লিটারের দুটি বোতল কিনেছি। একই এলাকার মুদির দোকানি রিয়াজ মিয়া বলেন, গত কয়েক দিন ধরে কোনো কোম্পানির ডিলারই তেল দিচ্ছে না, গ্রাহক এসে ফেরত যাচ্ছে।

শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ীরা আগের মজুদকৃত বোতলজাত সয়াবিন তেল এখন ড্রামে ঢেলে খোলাভাবে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবার ড্রামে ঢালা তেলের বোতলগুলোও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। অপরদিকে তেলের দাম বাড়ার আগে থেকেই বড় বড় ব্যবসায়ীরা বাজারগুলোতে তেল দেওয়া বন্ধ করে দেন। এতে করে সাধারণ মানুষও বিপাকে পড়ে যান তেল কিনতে না পেরে। তাই বেশি দাম দিয়েই তেল কিনতে হয়েছে তাদের।

জানা যায়, টাঙ্গাইলে বেশ কয়েকজন সয়াবিন তেলের বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি শক্তিশালি সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়আনি বাজারের ছানোয়ার হোসেন, দুলাল সাহা ও শংকর অন্যতম। তেলের দাম বাড়ার আগে থেকেই বাজারের বিভিন্ন দোকানে তেল দেওয়া বন্ধ করে দেন এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। পরবর্তীতে দাম বাড়ার ঘোষণা আসার পরপরই সিন্ডিকেটের সদস্যরা আগের দামে কেনা বোতলজাত সয়াবিন তেল ড্রামে ভরে খোলাভাবে ছয়আনি বাজার, পার্ক বাজার ও বটতলা বাজারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে সাপ্লাই দেওয়া শুরু করেন। আবার বোতলের গায়ে লাগানো লেবেল তুলেও বিক্রি করতে দেখা গেছে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে। তারা জানিয়েছেন, তেলগুলো আগের কেনা। তাই বর্তমানে দাম বাড়ায় লেবেল তুলে তারা বিক্রি করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্ক বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, তেল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যদের রয়েছে বড়বড় গোডাউন। আর সেই গোডাউনেই দাম বাড়ার আগেই তেল মজুদ করে রাখা হয়েছিল। এখন সেই বোতলজাত তেল ড্রামে ভরে খোলাভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এই খোলা সয়াবিন তেল তারা বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ১৮৫ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন ১৮০ টাকা দরে। তবে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি জানান, দু-একদিনের মধ্যেই বাজারগুলোতে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকেও ওই এলাকায় অভিযান পরিচালান করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে চাঁপাই পৌরসভার কল্যাণপুর ও বড়বাজার এলাকায় অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। মেসার্স সঞ্জয় স্টোর নামে একটি দোকানে দেখা গেছে, পাঁচ লিটার সোয়াবিন তেলের বোতলে আগের মূল্য মুছে নতুন করে বাড়তি দাম লিখে রাখা হয়েছে।
ভোক্তা অধিকারের চাঁপাইনবাবগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম জানান, আগে কেনা বোতলজাত তেল বেশি মুনাফার লোভে ড্রামে ভরে খোলা তেল হিসেবে বিক্রি করছিলেন সঞ্জয় স্টোরের মালিক সঞ্জয় সাহা। এ ছাড়া বোতলজাত তেলের গায়ে লেখা মূল্য মুছে নিজের মতো করে বেশি মূল্য লেখায় সঞ্জয় সাহাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় বেশি দামে সয়াবিন তেল বিক্রির অপরাধে তিন ব্যবসায়ীকে মোট ২১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল আদর্শ পৌরবাজারে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বাজার তদারকি দল।
সয়াবিন তেলের বোতলের গায়ে লেখা দাম ঘষে তুলে অতিরিক্ত দামে বিক্রির মুদির আদর্শ পৌরবাজারের নূর স্টোরকে ১০ হাজার, বোতলজাত তেল ঢেলে অতিরিক্ত দামে খোলা তেল হিসেবে বিক্রির অপরাধে শিরিন স্টোরকে ১০ হাজার এবং অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অপরাধে নুরজামান কাঁচামালকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মোট ২১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।