কোণঠাসা কিয়েভঃ যে কোন সময় পতন

পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে ইউক্রেনের একটি সামরিক স্থাপনায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৩৫ জন ইউক্রেনীয় নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও ১৩৪ জন। গতকাল ইউক্রেন সরকারের এক কর্মকর্তা এই হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি, রাজধানী কিয়েভ শহরের উপকণ্ঠে সঙ্ঘর্ষ তীব্র হওয়ার সাথে সাথে সর্বাত্মক রাশিয়ান হামলার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এদিকে, রাশিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেছেন, মস্কো ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্রের চালানকে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসাবে বিবেচনা করবে।

গতকাল ন্যাটোভুক্ত দেশ পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে ইউক্রেনের একটি বৃহৎ সামরিক স্থাপনায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ৩৬০ বর্গ কিলোমিটারের এই অঞ্চলটি ইউক্রেনের পশ্চিমাংশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। ওই অঞ্চলের গভর্নর ম্যাক্সিম কোজিটস্কি বলেছেন, ‘রাশিয়ার যুদ্ধবিমানগুলো ইয়াভোরিভ ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পিসকিপিং অ্যান্ড সিকিউরিটি সেন্টারে ৩০ টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত ও ১৩৪ জন আহত হয়েছেন।’ হামলার পাঁচ ঘণ্টা পরও ঘাঁটিতে আগুন জ্বলছে। হামলায় আহত কয়েক ডজন লোককে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘাঁটিতে থাকা একজন ইউক্রেনীয় সৈনিক যাকে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়নি তিনি বলেছিলেন যে, সেখানে টর্নিকেট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল। ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবাগুলি বলেছে যে, তারা অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।

কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২২টি ক্ষেপণাস্ত্রকে বাধা দিয়েছে, তবে অন্যগুলো ঘাঁটিতে আঘাত করেছে। ‘বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করেছে, বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে নামানো হয়েছে,’ কোজিটস্কি একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন। তিনি ইউক্রেনের উপর একটি নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাটোকে বারবার আহŸান জানিয়েছেন, এমন একটি পদক্ষেপ যা পশ্চিমা নেতারা তাদের রাশিয়ার সাথে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে টেনে আনতে পারে এমন উদ্বেগ থেকে সরে আসতে অস্বীকার করেছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সারাতোভ থেকে উড়ে আসা রুশ যুদ্ধবিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল পোলিশ সীমান্ত থেকে ১০ কিলোমিটারেরও কম দূরে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা ও নিরাপত্তা কেন্দ্র।

ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিবিসি ইউক্রেন জানিয়েছে, লভিভ শহরের ইন্টারন্যাশনাল পিস কিপিং অ্যান্ড সিকিউরিটি সেন্টার লক্ষ্য করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘাঁটিতে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকতো ন্যাটো বাহিনী। এদিকে, ইউক্রেনের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে স্থানীয় সময় শনিবার বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজতে শোনা গেছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। খারকিভ, চেরনিহিভ, সুমি ও মারিউপোলের মতো শহরগুলো ঘিরে রেখেছে রুশ বাহিনী। তারা শহরগুলোতে ব্যাপক বোমা হামলা চালাচ্ছে। এ ঘটনায় ন্যাটো তার সদস্য দেশের সীমান্তের এত কাছে হামলা চালানোর বিষয়ে ক্রেমলিনের কাছে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে ক্রেমলিন থেকে ন্যাটোর দাবির বিপরীতে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। গতকাল রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে মুখপাত্র এক সংক্ষিপ্ত ভিডিও ব্রিফিংয়ে এই ধরনের হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

বর্তমানে ইউক্রেনের বেসামরিক যোদ্ধারা এবং রাজধানীতে বাসিন্দারা একটি বড় আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে কারণ রাশিয়ান বাহিনী মাত্র কিলোমিটার দূরে সৈন্য ও আর্টিলারি দিয়ে শহরটিকে ঘিরে রেখেছে। কিয়েভ ও এর আশেপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধ সত্তে¡ও রুশ বাহিনী রাজধানীর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং গুলি চালানোর মতো অবস্থান গ্রহণ করেছে। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, কিয়েভ থেকে ৯ কিলোমিটার (৫ দশমিক ৬ মাইল) উত্তরে মোশচুন শহরে বাড়িঘর জ্বলছে।

রাশিয়ান সেনাবাহিনী কিয়েভের পশ্চিমে জাইটোমির অঞ্চলে আঘাত করেছে। তারা পরিকল্পনার অংশ হিসাবে রাজধানীর সরবরাহ লাইনগুলিকে বিঘিœত করার বা সম্পূর্ণভাবে কেটে ফেলছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কোনাশেনকভ বলেছেন, রাশিয়ার হামলায় কিয়েভের দক্ষিণে ভ্যাসিলকিভ শহরের বিমানবন্দর ধ্বংস হয়ে গেছে। যদিও ইউক্রেনীয় বাহিনী বলেছে যে তারা মারিউপোলের কাছে একটি রাশিয়ান ব্যাটালিয়ন প্রায় ধ্বংস করেছে, শহরটি বেসামরিক অবকাঠামো সহ – ভারী রাশিয়ান বোমাবর্ষণের অধীনে রয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনী অবরুদ্ধ শহরের পূর্ব উপকণ্ঠে এলাকাগুলো দখল করেছে। পূর্ব ইউক্রেনীয় শহর ভলনোভাখা ধ্বংস হয়ে গেছে তবে শহরটি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং একটি রাশিয়ান ঘেরাও প্রতিরোধে লড়াই চলছে, ডনেটস্কের গভর্নর পাভলো কিরিলেনকো বলেছেন। তিনি জানান, শনিবার সকাল থেকে রাশিয়ান বাহিনী তোচকান্ডইউ স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আভদিভকাকে আঘাত করেছে। শহরটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ডনেটস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী এলাকাগুলির সাথে সামনের সারিতে রয়েছে।
মার্কিন সাংবাদিক নিহত : ইউক্রেনের সঙ্ঘর্ষে পুরস্কার বিজয়ী আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংবাদিক ব্রেন্ট রেনাড নিহত হয়েছেন। এই তথ্য নিশ্চিত করে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠের একটি টানেলে রিপোর্ট করার সময় তিনি নিহত হন। ওই টানেলটি অস্ত্র পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত হত বলে জানা গেছে।

৫০ বছর বয়ষী রেনাড অতীতে এইচবিও, এনবিসি এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সহ বেশ কয়েকটি আমেরিকান সংবাদ এবং মিডিয়া সংস্থার জন্য কাজ করেছেন। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ইরপিন শহরতলিতে তিনি নিহত হয়েছেন, যেখানে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে রাশিয়ান বাহিনীর গোলাগুলি তীব্র হয়েছে। তবে তার মৃত্যুর বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আরও একজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। রেনাড তার ভাই ক্রেগের সাথে কাজ করতেন এবং শিকাগোতে একটি স্কুল সম্পর্কে একটি ভাইস নিউজ ডকুমেন্টারির জন্য পিবডি পুরস্কার জিতেছিলেন। দুজনে বিশ্বজুড়ে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল এবং হট স্পট থেকে ফিল্ম এবং টেলিভিশন প্রকল্পে কাজ করেছেন।

পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে রুশ সেনা: কিয়েভের চারপাশে রাশিয়ার ধীরগতি এবং পিষে ফেলা এবং অন্যান্য শহরের কেন্দ্রে বোমাবর্ষণ এবং কামান ও বিমান হামলা একটি পরিকল্পিত কৌশল যা রাশিয়ান বাহিনী পূর্বে অন্যান্য অভিযানে, বিশেষ করে সিরিয়া এবং চেচনিয়ায়, সশস্ত্র প্রতিরোধকে চূর্ণ করার জন্য ব্যবহার করেছে। আক্রমণকারী রাশিয়ান বাহিনী নির্ধারিত ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি লড়াই করেছে। কিন্তু রাশিয়ার শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের পশ্চিমমুখী, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের জন্য পশ্চিম থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তার চলমান প্রবাহ সত্তে¡ও প্রতিরক্ষা বাহিনীকে পিষে ফেলার হুমকি দেয়।
রাশিয়ার সৈন্যরা সম্ভবত বিদেশ থেকে শীঘ্রই আরও সাহায্য পাবে। পূর্ব ইউক্রেনের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলের রাশিয়া সমর্থিত প্রধান ডেনিস পুশিলিন শনিবার বলেছেন, তিনি আশা করেন যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ‘অনেক হাজার’ যোদ্ধা বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেবে এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘কাঁধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ লড়াই করবে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু শুক্রবার বলেছেন, রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১৬ হাজারেরও বেশি লোকের কাছ থেকে অনুরোধ পেয়েছে যারা ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে যোগ দিতে আগ্রহী। তিনি যোগ করেছেন যে, এই ব্যক্তিদের অনেকেই এর আগে রাশিয়ার সাথে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধ করেছে।

ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহে হামলা করতে পারে মস্কো: রাশিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াবকভ বলেছেন যে, মস্কো ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্রের চালানকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এটি রাশিয়ান বাহিনী এবং ন্যাটো সদস্য-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে যা বর্তমানে পোল্যান্ড এবং বাল্টিক দেশ হিসাবে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করছে। রিয়াবকভ শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, ‘আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়েছি যে বেশ কয়েকটি দেশ থেকে অস্ত্র সরবরাহ শুধুমাত্র একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ নয়, এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা এই কনভয়গুলোকে রাশিয়ার বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।’

নিষেধাজ্ঞায় তুরস্ক যোগ দেবে না: ইউক্রেনে বিশেষ অভিযানের জন্য রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমা কিছু দেশের নিষেধাজ্ঞায় তুরস্ক যোগ দেবে না। গতকাল তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু আন্টালিয়ায় একটি ক‚টনৈতিক ফোরামে বলেছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তুরস্কের অবস্থান সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে কাভুসোগলু বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধান করবে না।’ তিনি বলেন, ‘যেমন ধরুণ এয়ারস্পেস,ে মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুসারে আমাদের এটি বন্ধ করার কোন ক্ষমতা নেই। এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।’ ইতিমধ্যে, ন্যাটোর সেক্রেটারি-জেনারেল জেনস স্টলটেনবার্গ ক‚টনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে বলেছিলেন যে, জোটটি তার সমস্ত সদস্য মস্কোর উপর বিধিনিষেধ আরোপ করবে বলে আশা করেছিল। তবে তুরস্ক বারবার বলেছে যে, তাদের রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই যাতে তার নিজস্ব অর্থনীতির ক্ষতি না হয় এবং রাশিয়ার সাথে সংলাপের দরজা খোলা থাকে।

উল্লেখ্য, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ডনবাস প্রজাতন্ত্রের নেতাদের সহায়তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে ইউক্রেনে একটি বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের ভূখন্ড দখলের কোনো পরিকল্পনা মস্কোর নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন এবং আরও কয়েকটি দেশ বলেছে যে, তারা রাশিয়ার আইনি সত্তা এবং ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রবর্তন করছে। সূত্র : তাস, এপি, আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স।