যুক্তরাষ্ট্র জানতে চায় বাংলাদেশে আগামী সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া কেমন হবে?

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন তথা সবার ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন সফররত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যদের প্রতি মার্কিন প্রশাসন এবং দেশটির নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের প্রায় এই অভিন্ন জিজ্ঞাসা ছিল। জবাবে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেন, বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব কিছুই করছে সরকার। তাছাড়া নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু এবং নির্বিঘ্ন হবে এতে কারও কোনো সন্দেহ-সংশয় থাকা উচিত নয়। নির্বাচন নিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগ নাকচ করে বলা হয়, এতে ক্ষমতাসীন দল বা জোটের কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর চিন্তা নেই। বরং ভোটাররা যে রায় দিবে তা ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ মাথা পেতে নেবে।

২০২৪ সালের প্রথমদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে- এমনটা জানিয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা বলেন, নির্বাচনকে অবাধ করতে সরকারের প্রচেষ্টার প্রতি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা, সমর্থন ও সহযোগিতা একান্তভাবে আবশ্যক। কারণ ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর নিশ্চিতে গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা থাকা উচিত। ওয়াশিংটনের দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ৪ সদস্যের সংসদীয় দলটি ৪ দিন ওয়াশিংটনে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। সংসদীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি। দলের অন্য সদস্যরা হলেন- নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি; নাহিম রাজ্জাক এমপি এবং কাজী নাবিল আহমেদ এমপি। তারা স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কংগ্রেসম্যান, প্রভাবশালী সিনেটর এবং থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেছেন। সবখানেই মুখ্য আলোচ্য ছিল বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন।

ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ মিশন প্রচারিত গত দু’দিনের প্রেস রিলিজেও নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এবং সংসদীয় কমিটির সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের জবাবের অনেক কিছু উল্লেখ করা হয়। কূটনৈতিক সূত্র এটা নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল যেখানেই সুযোগ পেয়েছে সেখানেই আসন্ন নির্বাচন প্রশ্নে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনের চেষ্টা করেছে।

আসন্ন নির্বাচনে মার্কিন পর্যবেক্ষকদের আগাম আমন্ত্রণ জানানো হয়। একই সঙ্গে যেকোনো গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানো হয়। সংসদীয় প্রতিনিধিদলের কথাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নোটে নিয়েছেন মার্কিন আইনপ্রণেতা, বাইডেন প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
দু’দেশের সম্পর্ক নিবিড় করতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ : এদিকে গত শুক্রবার বাংলাদেশ মিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সংসদীয় প্রতিনিধিদল বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও নিবিড় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। আগের দিন বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যাম্বাসেডর ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে স্টেট ডিপার্টমেন্টে এবং কংগ্রেসম্যান ডোয়াইট ইভান্সের সঙ্গে ক্যাপিটল হিলে বৈঠকে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ওই অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রতিনিধিদলটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়। এসব বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সহিদুল ইসলামসহ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে বৈঠক : সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মতে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যাম্বাসেডর ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে সংসদীয় দলের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এতে উভয়েই সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অ্যাম্বাসেডর লু করোনা মহামারি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এর ভ্যাকসিন বিতরণ ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বলে অভিহিত করেন। তিনি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং করোনা সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে মন্তব্য করে বলেন এসব খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়তে পারে। আইসিটি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। সিলিকন ভ্যালি ও বাংলাদেশ হাইটেক পার্কের মধ্যে সহযোগিতা সমপ্রসারণের ওপর জোর দেয়া হয়। সফররত প্রতিনিধিদল বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি রাশেদ চৌধুরীকে দ্রুত প্রত্যর্পণে বাইডেন প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। তারা র‌্যাব ও এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর সামপ্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও তুলে ধরেন। প্রতিনিধিদলের নেতা ফারুক খান দু’দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করতে বাংলাদেশ বিমানের ঢাকাণ্ডনিউ ইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর ওপর জোর দেন।

কংগ্রেসম্যান ইভান্সের সঙ্গে বৈঠক : বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র হাউস ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কংগ্রেসম্যান ডোয়াইট ইভান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। বৈঠকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করে কংগ্রেসম্যান ইভান্স আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্রে সফর ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য তার অব্যাহত সমর্থনের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশ-মার্কিন অংশীদারিত্বের আশ্বাস দেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রশংসা করা ছাড়াও ঢাকার প্রতিনিধিরা বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে মিয়ানমারের ওপর মার্কিন চাপ অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। উভয় পক্ষই ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর ব্যাপারে তাগিদ অনুভব করেন। এর ফলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্ক ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

আইআরআই-এ গোলটেবিল বৈঠক : সংসদীয় দলটি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) সঙ্গে গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেয়। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট ড. ড্যানিয়েল টুইনিং আইআরআই পক্ষের নেতৃত্ব দেন। বৈঠকে আইআরআই’র এশিয়া বিভাগের পরিচালক জোহানা কাও, ডেপুটি ডিরেক্টর রোন্ডা মেস, সহযোগী পরিচালক ম্যাট কার্টার, সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার রোহুল্লাহ নিয়াজি, বাংলাদেশ প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ড এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা জানান, বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালের প্রথমদিকে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকারের প্রচেষ্টায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও সহায়তা দরকার। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য আইআরআই’র সহায়তাকে সংসদীয় প্রতিনিধিদল স্বাগত জানায়।

উল্লেখ্য, আগের দিন মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ (রিপাবলিকান-টেক্সাস) এবং কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাবোট (রিপাবলিকান-ওহিও)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় দলের পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।