দেশের সামনে বড় বিপদ

করোনা

পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। দেশে করো’নাভাই’রাসে আ’ক্রান্ত ও মৃ'’ত্যুতে রেকর্ড হচ্ছে প্রতিদিনই। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আরও এক হাজার ৭৭৩ জনের শরীরে করো’নার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। প্রা’ণ হারিয়েছেন আরও ২২ জন। দেশে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ আ’ক্রান্ত ও মৃ'’ত্যুর সংখ্যা। এ নিয়ে করো’নায় মৃ'’ত্যুর সংখ্যা চারশ’ ছাড়াল। মোট মৃ'’ত্যু ৪০৮ জনের। আর মোট আ’ক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ৫১১। গত চব্বিশ ঘণ্টায় আরও আরও ৩৯৫ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এ নিয়ে পাঁচ হাজার ৬০২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্নেষণে দেখা যায়, দুই-একজনের মাধ্যমে ভাই’রাসটি এখন দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। দেশে এই মুহূর্তে কতসংখ্যক মানুষ করো’নায় সংক্রমিত হয়েছেন, তার সঠিক হিসাব নেই। চাহিদা অনুযায়ী সব মানুষকে নমুনা পরীক্ষার আওতায় আনা যায়নি। তবে গত চব্বিশ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। পরীক্ষার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। তাদের মতে, পরীক্ষার পরিধি বাড়লেই আ’ক্রান্তের সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাব'ে। আর এর মাধ্যমে আ’ক্রান্তদের আইসোলেশনে ও তার সংস্প’র্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে করো’না প্রতিরোধ সম্ভব হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও বক্তব্য এটি। কিন্তু শুরু থেকেই নমুনা পরীক্ষার পরিধি ছিল একেবারে সীমিত। সংক্রমণ শুরুর এক মাস পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে একশ’ অ’তিক্রম করেনি। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নমুনা পরীক্ষার পরিধি ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়।

এ বি'ষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, শুরু থেকেই নমুনা পরীক্ষা নিয়ে একটি কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে তবেই একজন নমুনা পরীক্ষা করাতে পারছেন। শুরুতে কেবল বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। দেশের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষণ-উপসর্গ থাকার পরও তাদের পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। এতে করে আ’ক্রান্ত অনেকে বিভিন্ন হাসপাতা’লে চিকিৎসার জন্য ঘুরেছেন। রাস্তাঘাটে ঘুরেছেন। এভাবে আ’ক্রান্ত ব্যক্তি বিভিন্নজনের সংস্প’র্শে গিয়ে রোগটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরাও আ’ক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে নমুনা পরীক্ষার পরিধি বেড়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় তা অ’প্রতুল। বর্তমান পরিস্থিতিতে দিনে অন্তত ২৫ হাজার নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. র'শিদ-ই মাহবুব বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে দেশব্যাপী করো’নাভাই’রাসের বিস্তার ঘটেছে- এটি বলাই যায়। শুরু থেকে এর গু'রুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। পারলে কর্মক’র্তা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেন। নমুনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে কন্টাক্ট ট্রেসিং, হাসপাতা’লে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা- কোনো কিছুই যথাযথভাবে হয়নি। প্রতিদিন যে সংখ্যক মানুষ আ’ক্রান্ত হচ্ছেন তার বিপরীতে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তির সংখ্যা কম। ২০ শতাংশ মানুষেরও যদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে আগামীতে চাহিদা অনুযায়ী সবাইকে হাসপাতা’লে ভর্তি করাও সম্ভব হবে না। সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই এমনটি হয়েছে।

পরিস্থিতি অবনতিশীল : আ’ক্রান্ত ও মৃ'’ত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্নেষণে দেখা যায়, দেশে করো’না পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। সংক্রমণ শুরুর হয়ে ১১তম স'প্ত াহে এসে আ’ক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশে প্রথম করো’না রোগী শনাক্ত হয় ৮ মা’র্চ। ১১তম স'প্ত াহ হচ্ছে ১৭ থেকে ২৩ মে। এই স'প্ত াহের এখনও দুই দিন বাকি। স'প্ত াহের হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়- ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত অষ্টম স'প্ত াহে শনাক্তের সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৭৯২। ওই স'প্ত াহে সুস্থ হয়েছিলেন ৬৪ জন এবং মা’রা গিয়েছিলেন ৩৫ জন। ৩ মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত নবম স'প্ত াহে শনাক্ত হয়েছিলেন চার হাজার ৯৮০ জন, সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ৩৩৭ জন এবং মা’রা যান ৩৯ জন। ১০ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত দশম স'প্ত াহে এসে শনাক্ত সাত হাজার ২২৫, সুস্থ এক হাজার ৭০৩ জন এবং মৃ'’ত্যু ১০০ জনের। ১১তম স'প্ত াহের দুই দিন বাকি থাকতে আ’ক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৫৩৪ জনে পৌঁছে। সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৫ জন। মৃ'’ত্যু হয়েছে ৯৪ জনের। দুই দিন বাকি থাকতেই ৩০৯ জন বেশি আ’ক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। প্রতিদিনই নতুন করে দেড় হাজারের বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। এ গতি অব্যা'হত থাকলে সামনে আরও খা’রাপ দিন দেখতে 'হতে পারে বলে আশ’ঙ্কা স্বাস্থ্য খাত সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের।

স্বাস্থ্য অধিদ'প্ত রের বুলেটিন : নিয়মিত ভা’র্চুয়াল বুলেটিনে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদ'প্ত রের দায়িত্বপ্রা'প্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা সর্বশেষ করো’না পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, চব্বিশ ঘণ্টায় যারা মা’রা গেছেন তাদের ১৯ জন পুরুষ এবং তিনজন নারী। তাদের মধ্যে ১১ থেকে ২০ বছরের দু’জন, ত্রিশোর্ধ্ব একজন, চল্লিশোর্ধ্ব দুজন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ১০ জন, ষাটোর্ধ্ব তিনজন, সত্তরোর্ধ্ব দু’জন এবং ৮১ থেকে ৯০ বছর বয়সী দু’জন।

এলাকাভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, মৃ'’তদের মধ্যে ১০ জন ঢাকা বিভাগের, আট'জন চট্টগ্রাম বিভাগের, তিনজন সিলেট বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা। ঢাকা বিভাগের মধ্যে রাজধানীর আট'জন, ঢাকা জে’লার একজন ও নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা একজন। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম জে’লার চারজন, চাঁদপুরের তিনজন ও কক্সবাজারের একজন। সিলেট বিভাগের মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের একজন এবং অন্যান্য জে’লার দু’জন ছিলেন। ময়মনসিংহে একজনের মৃ'’ত্যু হয়েছে।

আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, চব্বিশ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে আরও ১৫৪ জনকে এবং বর্তমানে আইসোলেশনে রয়েছেন তিন হাজার ৮৯৭ জন। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বি'ষয়ে ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, সারাদেশে আইসোলেশন শয্যা আছে ১৩ হাজার ২৮৪টি। এর মধ্যে রাজধানীতে সাত হাজার ২৫০টি এবং ঢাকার বাইরে আছে ছয় হাজার ৩৪টি। সারাদেশে আইসিইউ শয্যা ৩৯৯টি ও ডায়ালাইসিস ইউনিট আছে ১০৬টি। দেশের বিভিন্ন জে’লা-উপজে’লা পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য ৬২৬টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সেবা দেওয়া যাব'ে ৩১ হাজার ৮৪০ জনকে।

সংক্রমণ চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে -স্বাস্থ্যমন্ত্রী : দেশে করো’না সংক্রমণ চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে মন্তব্য করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সবাইকে সতর্ক থাকার পরাম’র্শ দিয়েছেন। গতকাল সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘দেশে করো’না সংক্রমণের ৭০ দিন পার হয়েছে। আমি মনে করি, আম’রা পিকটাইমের দিকে যাচ্ছি। দিনে শনাক্তের হার কমতে শুরু করলে বলতে পারব যে, পিকে পৌঁছে গেছি। এখন সংক্রমণ বাড়ছে। তার পরও আমি মনে করি, তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না, ঠিকই আছে।’

করো’না প্রতিরোধে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের রেমডিসিভির গ্রহণকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আম’রা করো’না রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। দেশে প্রতিনিয়তই রোগী বাড়ছে। তবে তুলনামূলকভাবে আম’রা অন্য দেশের তুলনায় এখনও ভালো আছি। আমা'দের কমিটমেন্ট ছিল, মে মাসে প্রতিদিন ১০ হাজার টেস্ট করার, দু’দিন আগেই সেটা হয়ে গেছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরা, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া অনুসরণ করতে হবে। বাজারঘাটে যাতে লোক কম যায়। ঈদ ঘিরে ফেরিঘাটে মানুষ জটলা পাকায়, সেখানে সংক্রমণের একটি আশ’ঙ্কা রয়েছে। সরকার যথেষ্ট চেষ্টা করেছে তাদের ঠেকাতে। তবুও মানুষ চলে যাচ্ছেন। মায়েরা কাপড়চোপড় কিনতে যাচ্ছেন, ছোট বাচ্চাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি অনুরোধ করব- আপনারা যাব'েন না, বাচ্চাদের নিয়ে যাব'েন না। নিজেরাও আ’ক্রান্ত হবেন, শি’শুরাও আ’ক্রান্ত হয়ে যাব'ে। ঈদ তখন আর আনন্দের থাকবে না, নিরানন্দ হবে। দেখা যাব'ে একটা বিরাট ক্ষ'তি হয়ে গেছে। এই ক্ষ'তি থেকে বেঁচে থাকতে হবে।’

বেক্সিমকো ফার্মাসিটিক্যালসের প্রস্তুতকৃত রেমডেসিভির প্রসঙ্গে জাহিদ মালেক বলেন, মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে এই ওষুধটি ব্যবহার হবে। তবে সে ব্যাপারে সি'দ্ধান্ত নেবেন বিশেষজ্ঞরা। আশা করি, এটি দিয়ে মানুষের উপকার হবে, জীবন রক্ষা হবে। করো’না প্রতিরোধের কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ এখনও তৈরি হয়নি। বেশ কিছু ওষুধ বাজারে এসেছে। এগু'লো কিছু কিছু মাত্রায় কাজ করে। কোনোটিতেই শতভাগ কাজ হচ্ছে না।